বাল্টিমোর থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে

—বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর শহরের মেয়র মিস্টার ব্রেন্ডন স্কট যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দ্বারা জিয়াউর রহমানের নামে আগে নামকৃত সড়ক থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলেছেন, সে খবরটি আমাদের দেশের গণমাধ্যমে তেমন একটা প্রচার না পেলেও ম্যারিল্যান্ডে খবরটি বেশ প্রাধান্য পেয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙালিরাই আনন্দে মেতে ওঠেননি, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও উল্লসিত হয়েছেন এই জেনে যে যে জিয়ার নামে বাল্টিমোরের একটি সড়কের নামকরণ হয়েছিল, সে জিয়াকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতই ‘ঠান্ড মাথার খুনি’, ‘অস্ত্রবলে ক্ষমতার জবরদখলদার’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘সংবিধানের এবং গণতন্ত্রের ধ্বংসকারক’, ‘জাতীয় প্রতারক’, ‘শপথ ভঙ্গকারী’ প্রভৃতি নিন্দাসূচক বিশ্লেষণে আখ্যায়িত করেছেন। তারা অবাক হয়েছেন এটা ভেবে যে জিয়াউর রহমানের আসল রূপ কেন বাল্টিমোর কর্তৃপক্ষ আগে জানতে পারেননি। তা অবশ্য না জানারই কথা। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া-মোশতাকের ভূমিকা এবং তাদের দ্বারা সংবিধান লঙ্ঘন করে অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা জবরদখলের সংবাদ বিশ্ব গণমাধ্যমে ছাপা হলেও বাল্টিমোরের বর্তমান প্রজন্মের কর্তৃপক্ষের কাছে তা না জানারই কথা। তার ওপর বিএনপি তাদের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকার ঝুলি নিয়ে নেমেছিল ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের মতো একটি জায়গায় জিয়ার নামে একটি সড়কের নামকরণের লক্ষ্য নিয়ে। তারা ভেবেছিল এতে তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতার ভাবমূর্তি বিশ্বময় উন্নীত হবে, তার কুকর্মগুলো ঢেকে যাবে। অর্থের প্রাচুর্য নিয়ে তারা চুক্তি করল একটি অভিজ্ঞ লবিস্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটি বিএনপি নেতাদের খুশি করার জন্য বাল্টিমোর মেয়রকে মিথ্যাচারের মাধ্যমে এই মর্মে বোঝাতে শুরু করল যে জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, সে বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ইত্যাদি। লবিস্ট ফার্মের দক্ষ এবং লাগাতার পীড়াপীড়িতে একপর্যায়ে বাল্টিমোরের মেয়র ধরে নেন যে লবিস্টরা যা বলছেন তা ঠিক। তিনি যে ভুলটি করছিলেন তা হলো তিনি অতীতের গণমাধ্যমের প্রকাশনাগুলো দেখেননি, বিশ্লেষণ করেননি।

এ খবর প্রকাশের পর আমরা কজন যখন ঢাকা থেকে তথ্য-প্রমাণ এবং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বেশকটি রায়ের কপি সরাসরি মেয়রের কাছে পাঠিয়ে মেয়রের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করলাম এবং পরে জুম বৈঠকের মাধ্যমে বোঝাতে পারলাম যে লবিস্টরা জিয়া সম্পর্কে যা বলেছেন, জিয়া আসলে ঠিক তার উল্টো, অর্থাৎ সে মোটেও স্বাধীনতার ঘোষক ছিল না, স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান যার জন্য বাংলাদেশে তিনি জাতির জনক হিসেবে, বাঙালির বন্ধু উপাধিতে এবং বিবিসি পরিচালিত সমীক্ষায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন। অন্যদিকে আমাদের সর্বোচ্চ আদালত জিয়াকে বেশকটি রায়ে ঠান্ডা মাথার খুনি, অস্ত্রবলে অবৈধ ক্ষমতা দখলদার, সংবিধান ও গণতন্ত্র ধ্বংসকারী, শপথ ভঙ্গকারী, দেশদ্রোহী, জাতির প্রতি প্রতারণা এবং বিশ্বাসঘাতকতাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন সে বেঁচে থাকলে তার বিচার হতো, তাকে ঘৃণা করতে বলেছে, সে জাতির জনক হত্যার মূল কুশীলব ছিল, জাতির পিতা হত্যাকারীদের বিচার থেকে রক্ষা করেছে, তাদের উঁচু পদে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়েছে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাকে জাতির জনক হত্যার জন্য ঘৃণার চোখে দেখে, তার মরণোত্তর বিচার দাবি করছে, তখন মেয়র সাহেবের আর জিয়ার প্রকৃত রূপ সম্পর্কে যে ভ্রান্ত এবং অমূলক ধারণাসমূহ বিএনপি লবিস্টরা দিয়েছিলেন, তা যে মিথ্যাচারে ভরপুর এবং প্রতারণামূলক সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কিছু বাকি রইল না, কেননা আমরা সর্বোচ্চ আদালতের রায়সমূহ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ মেয়র সাহেবকে সরাসরি পাঠিয়েছিলাম। মেয়র সাহেবের কাছে জিয়ার আসল রূপ প্রকাশ করার ব্যাপারে যারা মূল এবং যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, কেননা এ দুজনই আমার বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন কৌশল নির্ধারণের জন্য এবং সে বৈঠকেই আমরা ঠিক করেছিলাম বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের জিয়াবিরোধী মন্তব্যগুলো বাল্টিমোরের মেয়রের দৃষ্টিতে আনার কথা, যা ছিল অপরিহার্য, যার বিকল্প ছিল না। বস্তুত ঢাকা থেকে আমাদের পাঠানো তথ্য-প্রমাণসমৃদ্ধ নথি পাওয়ার পরই বাল্টিমোর কর্তৃপক্ষ তাদের আগের ভুল বুঝতে পারেন। এ সাফল্যের পেছনে ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া এবং ড. সেলিম মাহমুদই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার, কেননা আমরা সর্বোচ্চ আদালতের রায়গুলো না পাঠালে বাল্টিমোরের মেয়র সাহেব তার আগের সিদ্ধান্ত পাল্টাতেন না, আর তিনি এ নথির জন্যই অপেক্ষমাণ ছিলেন। পরে মেয়র সাহেব ৯ সেপ্টেম্বর একটি জুম বৈঠকের আয়োজন করলে আমরা এ মর্মে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করি যে আব্রাহাম লিংকন এবং প্রধান বিচারপতি মার্শালের দেশে আদালত কর্তৃক ঘোষিত ঠান্ডা মাথার খুনির নামে কোনো সড়কের নাম হতে পারে না। ওই জুম বৈঠক চলাকালেই সংশ্লিষ্ট সড়ক থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলার যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা বাল্টিমোর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন। এখন সেটি অনুসরণ করা আমাদের জন্য ফরজ হয়ে পড়েছে। যেখানে একটি বিদেশি রাষ্ট্র জিয়ার আসল রূপ বিবেচনা করে সড়ক থেকে তার নাম মুছে ফেলে দিল, সেখানে কী করে সংসদ এলাকায় জিয়ার নামে কবর থাকতে পারে (যদিও সেটি আসলে জিয়ার কবর নয় বলে প্রায় সবারই বিশ্বাস), কী করেই চট্টগ্রামে সরকারি অর্থে পরিচালিত জিয়া জাদুঘর নামে, জিয়ার বিরাটকায় ভাস্কর্যসহ একটি জাদুঘর থাকতে পারে? তা নিয়ে জনমনে অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই প্রশ্ন উঠেছে। জিয়ার কবর বলে যেখানে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, সেটি করা হয়েছে সংসদ এলাকার সব বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে, মূল নীলনকশা ভঙ্গ করে। তার ওপর অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো, চট্টগ্রামে জিয়ার নামে যে জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে তার জন্য সরকার প্রতি বছর বিরাট অঙ্কের টাকা অপচয় করে এই তথাকথিত জাদুঘরের নামে একটি সাদা হাতি পালন করছে এমন এক ব্যক্তির নামে যাকে সর্বোচ্চ আদালত ঠান্ডা মাথার খুনি, দেশদ্রোহী, সংবিধান ধ্বংসকারী প্রভৃতি শব্দে আখ্যায়িত করেছেন। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের এহেন ধৃষ্টতা শুধু লজ্জাজনকই নয়, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি চরম অবমাননাকরও বটে, বিশেষ করে সর্বোচ্চ আদালত যখন পরিষ্কার এবং বোধগম্য ভাষায় বলেছেন, জিয়া গংকে আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ধরা যাবে না। জিয়ার তথাকথিত কবর এবং চট্টগ্রামে জিয়া জাদুঘর অপসারণ করা তাই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, একইভাবে এবং একই নীতি অনুসরণ করে যা করেছেন বাল্টিমোর সিটি কর্তৃপক্ষ। আমরা তাদের নীতি অনুসরণ না করলে বিশ্ববাসী আমাদের মুখে চুনকালি দেবে। জিয়ার নামে যে শুধু চন্দ্রিমা উদ্যানে ভৌতিক কবর আর চট্টগ্রামে লজ্জাকর জাদুঘরই রয়েছে তা নয়, রয়েছে সরকারচালিত আরও অনেক স্থাপনা যার মধ্যে রয়েছে বগুড়ায় একটি হাসপাতালসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু চিকিৎসালয়। চট্টগ্রামে একটি শিশু পার্ক রয়েছে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হল, বিভিন্ন জায়গায় জিয়ার নামধারী বিদ্যায়তন যার শিক্ষকগণ সরকার থেকে বেতন পাচ্ছেন। জামালপুর শহরে জিয়ার নামে কলেজ রয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সামনের রাস্তাটির নামও জিয়ার নামে। এ ছাড়া ঢাকাস্থ শিশু পার্কের অডিটোরিয়াম, হযরতপুরে একটি স্নাতক কলেজ, কেরানীগঞ্জের হিজলায় একটি উচ্চবিদ্যালয় ছাড়াও জিয়া হল নামে একটি হল রয়েছে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া মোড়ে, একই নামে হল রয়েছে খুলনা শিববাড়ী মোড়ে এবং সারা দেশের আরও বহু জায়গায়।

আমি হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি থাকাকালে কুখ্যাত রাজাকার খান এ সবুরের নামে খুলনার একটি মহাসড়কের নামসহ অন্য রাজাকারদের নামসংবলিত স্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানের নাম মুছে দেওয়ার জন্য আদেশ দিলেও সেগুলো যথাসময়ে পালন না করে কর্তৃপক্ষ আদালত অবমাননা করেছিলেন। কিন্তু তখন আমি আপিল বিভাগে পদোন্নতি পাওয়ায় অবমাননাকারীদের শাস্তি দিতে পারিনি। পরে অবশ্য কর্তৃপক্ষ সবুর খান এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল থেকে কয়েকজন রাজাকারের নাম মুছে দিয়েছেন। সে ধারা অনুসরণ করে জিয়ার নামের সব চিহ্ন, সড়ক, প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম মুছে না দিলে একদিকে যেমন গণরোষ বাড়তে থাকবে, তেমনি বিদেশিদের কাছে আমরা হাসির পাত্রে পরিণত হব।

 

আমরা যদি এগুলো বিনা বিলম্বে উৎখাত করতে ব্যর্থ হই তাহলে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ আমাদের নিয়ে হাস্য-কৌতুক করবে। ঠান্ডা মাথার খুনির স্মৃতি যদি যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ সরিয়ে ফেলতে পারেন তাহলে আমরা কেন তা পারব না? আর যারা জিয়ার নামকীর্তনে গদগদ তাদের তো সাহস হলো না বাল্টিমোরের পদক্ষেপে বাধা দিতে বা প্রতিবাদ করতে, কেননা প্রতিবাদ করার ভাষা বা যুক্তি তাদের নেই। যা-ই হোক, আমরা যদি সব স্থান থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলতে না পারি তাহলে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হবে।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।